Advertisement

Responsive Advertisement

আলগা পিরিত নয়, ভারতের সাথে সম্পর্ক হবে টেবিল চাপড়ে হিসাব নেওয়ার!

 আলগা পিরিত নয়, ভারতের সাথে সম্পর্ক হবে টেবিল চাপড়ে হিসাব নেওয়ার!


ভারতের সাথে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত? আবেগে ভেসে নয়, ট্রাঞ্জেকশনাল কূটনীতিতেই বাংলাদেশের শক্তি!

আমার অনেক বন্ধুর সাথেই হয়তো এই জায়গায় বিনয়ের সাথে দ্বিমত করব। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি—মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভারতে যাওয়া উচিত। তবে সেই সফর কোনো আলগা পিরিতের সফর হবে না। মুখোমুখি বসা, প্রয়োজনে কড়া ভাষায় দরকষাকষি করা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম ও যৌক্তিক দাবিগুলো নিয়ে শক্ত অবস্থান নেওয়া—সফর বয়কট করার চেয়ে অনেক গুণ বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।

ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার। ২০১৩ সালে ম্যাডামের (বেগম খালেদা জিয়া) ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সাথে দেখা করা উচিত ছিল। সোনারগাঁও হোটেলের মিটিংয়ে গিয়ে ভারতের বাংলাদেশ পলিসির তীব্র বিরোধিতা সামনাসামনি করা দরকার ছিল। উনি সেট করা এজেন্ডায় অংশ নেননি, যার ফল আমাদের পক্ষে আসেনি। মিটিং হলে আমরা সুবিধাজনক অবস্থানে (Upper hand) থাকতাম, কিন্তু ভারত সেটা নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছিল। মনে করিয়ে দিতে চাই—প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান 'পূর্বমুখী কূটনীতি' পরিচালনা করার পরও কৌশলগত কারণে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে মিটিং করতে দিল্লি গিয়েছিলেন। 

তবে কথা একটাই—বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে কোনো 'খুচরা দাওয়াত' দিলে হবে না। পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল এবং সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে 'প্রধানমন্ত্রী' হিসেবেই ইনভাইট করতে হবে। বিমসটেকের মতো সাধারণ দাওয়াতে আমি নিজেও ভারত যাইনি, আমাদের দুই কর্মকর্তাকে পাঠিয়েছি। 

আর এই বৈঠকের টেবিল হতে হবে সলিড এজেন্ডা দিয়ে সাজানো:

১. পানির ন্যায্য হিস্যা: গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়ন এবং তিস্তা চুক্তির স্পষ্ট টাইমলাইন।  
২. অপরাধীদের প্রত্যর্পণ: দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া এবং শহীদ ওসমান হাদীসহ অন্যান্য শহীদদের খুনিদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া।  
৩. গণতন্ত্রে হস্তক্ষেপ বন্ধ: গত ১৭ বছর বাংলাদেশে একদলীয় শাসন বজায় রাখা এবং ডেমোক্রেসি ডেফিসিটে ভারতের প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট কথা বলা। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো বন্ধ করতে হবে।  
৪. সীমান্ত ও বাণিজ্য: সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামানো এবং ভারতের সাথে চলমান বিরাট বাণিজ্য ব্যবধান কমানো।  
৫. অসমাপ্ত প্রজেক্টের সমাধান: বিগত সরকারের আমলের ইন্ডিয়ান 'লাইন অফ ক্রেডিট' (LOC)-এর যেসব প্রজেক্টের ৬০–৭০% কাজ হয়ে গেছে, সেগুলোর স্পেসিফিকেশন আপডেট করে দ্রুত শেষ করা। আর বাকিগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করে ঝুলন্ত ঋণপ্রকল্পের গতি করা।  

আমাদের অবস্থান হবে একদম কাট-কাট: "আমরা প্রতিবেশী পরিবর্তন করতে পারব না, কিন্তু ট্রাঞ্জেকশনাল রিলেশনে বিশ্বাস করি। তুমি আমার দেশের স্বৈরাচারকে মদদ দিয়েছ—এজন্য দায় নিতে হবে। আমার দেশের সংখ্যালঘু ইস্যু নিয়ে কাল্পনিক রাজনীতি করা যাবে না। আর আমরা যে বছর ১০-১১ বিলিয়ন ডলারের ভারতীয় পণ্য কিনি, সেখানে কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে আমরা বিকল্প আমদানির পথে হাঁটব।"

পাশাপাশি, ভারতকেও একটি সলিড আশ্বাস দিতে হবে—তাদের যৌক্তিক নিরাপত্তার ঝুঁকি বা ভ্যালিড সিকিউরিটি কনসার্ন বাংলাদেশ সমাধান করবে। তবে তারা ২০০১-০৬ সালের মতো আর কোনো 'মাইনরিটি কার্ড' বা 'জঙ্গি কার্ড' খেলতে পারবে না। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরিতে ব্যাকস্টেজ অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে। 

শুরুতে আমাদের সরকার হয়তো ভালোবাসা দিয়ে বন্ধু বানাতে চেয়েছিল, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ভারত সামনে এক কথা বলে, পেছনে আরেক কাজ করে। দিল্লিতে বসে হাসিনাকে নানাভাবে পুনর্বাসিত করার চেষ্টা চলছে। এটা বন্ধে সরাসরি সংঘাতের চেয়ে সরাসরি 'হার্ড টক' বা মুখোমুখি শক্ত আলোচনাই শ্রেয়। 

ভারতকে বুঝতে হবে—বাংলাদেশের আদালতের রায়কে সম্মান না করলে কাল যদি ভারতের কোনো সন্ত্রাসী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, তবে বাংলাদেশও একই আচরণ করতে পারে। অতীতে উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ভারত পেয়েছিল বাংলাদেশের সহায়তায়। ভবিষ্যতেও ভারতের এমন সাহায্য লাগবে। 

আমাদের বার্গেইনিং পাওয়ার মোটেও কম নয়। ১০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজার আমাদের হাতে। নিজেদের এই শক্তিকে আমাদের চিনতে হবে।

ভারতের সাথে আমাদের আলগা পিরিতের কোনো দরকার নেই, আবার অহেতুক ডিরেক্ট এস্কেলেশনে যাওয়ারও দরকার নেই। সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদা, ন্যায্যতা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থভিত্তিক (Equity-centric & Transactional)। 

আমরা প্রস্তুতি নিয়েই টেবিলে বসব। নিজেদের পাওনা বুঝে নেওয়ার সাহস আমাদের থাকতে হবে!

#BangladeshForeignPolicy #BangladeshIndiaRelations #EquitableDiplomacy #NationalInterest #BilateralDialogue #DiplomacyFirst #NationalSovereignty #TradeAndSecurity




Post a Comment

0 Comments